০৩:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দমন-পীড়নের যে লোহমর্ষক বর্ণনা দিলেন ইরানে বিক্ষোভকারীরা

  • Update Time : ১২:৪৯:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬
  • 79

মানুষ আমাদের সাহায্য করেছিল এবং আমরা একটি গাড়িতে উঠেছিলাম… আমি বলেছিলাম, আমাদের হাসপাতালে নিও না। তারা (ছদ্মনাম) নামের একজন বিক্ষোভকারী এবং তার বন্ধু ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইসফাহানে একটি বিক্ষোভে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই মোটরসাইকেলে করে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আসে এবং জনগণের উদ্দেশ্যে চিৎকার করতে শুরু করে। বিক্ষোভের সময় ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর চলা দমন-পীড়নের চিত্র এভাবে প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে বিবিসি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি বলেন, আমার বন্ধু নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সশস্ত্র সদস্যকে বলেন, আমাদের গুলি করেন না এবং সে তখনই আমাদেরকে লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটি গুলি চালায়। আমরা মাটিতে পড়ে যাই। আমাদের সব পোশাক রক্তে ভেজা ছিল।

তারা ও তার বন্ধুদের একজন অপরিচিত ব্যক্তির গাড়িতে তোলা হয়েছিলে। কিন্তু তারা বলছিল যে, গ্রেফতারের ঝুঁকির কারণে হাসপাতালে যেতে ভয় পাচ্ছিলেন তারা। সব গলিপথে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ছিলেন, তাই আমি সদর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা এক দম্পতিকে আমাদের ভেতরে ঢুকতে দিতে অনুরোধ করেছিলাম।

তারা জানান, প্রায় ভোর না হওয়া পর্যন্ত তারা ওই দম্পতির বাড়িতেই ছিলেন। এরপর তাদের পরিচিত এক চিকিৎসককে খুঁজে পান, যিনি তাদের পায়ের ক্ষত পরিষ্কার করে দেন।

তিনি বলেন, বাড়িতেই কিছু ক্ষত অপসারণ করতে সক্ষম হন এক সার্জন। কিন্তু তিনি তাদের সতর্ক করেছিলেন যে, এগুলো পরে অপসারণ করা যাবে না এবং আপনার শরীরে থেকে যাবে।

চলতি মাসে ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের ফলে কী পরিমাণ হতাহত হয়েছেন তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো জানা যায়নি। কারণ ইন্টারনেট বন্ধ এবং বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের রিপোর্টিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি বা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, তারা ইরানে চলমান আন্দোলনে ছয় হাজার ৩০১ জনের মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে।

যাদের মধ্যে পাঁচ হাজার ৯২৫ বিক্ষোভকারী, ১১২ শিশু, ৫০ পথচারী এবং ২১৪ সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। এই মানবাধিকার সংগঠনটি আরও ১৭ হাজার ৯১ জনের মৃত্যুর প্রতিবেদন অনুসন্ধান করছে।

কমপক্ষে আরও ১১ হাজার আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে এই সংগঠনটি ধারণা করছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিবিসিকে বলেছেন, গ্রেফতারের ভয়ে হাসপাতালে গিয়ে আঘাতের চিকিৎসা নেওয়া এড়িয়ে গেছেন তারা।

বাড়িতে গোপনে চিকিৎসা করে নিজেদের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা এ কারণে চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা বিবিসিকে আরও জানিয়েছেন, হাসপাতালগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনী উপস্থিত রয়েছে।

আহত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার জন্য মেডিকেল রেকর্ড তারা অনবরত পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন। তেহরানের এক সার্জন নিমা বলেন, ৮ জানুয়ারি যখন কর্তৃপক্ষ চলমান আন্দোলনে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করে, তখন তিনি কাজে যাওয়ার পথে রাস্তায় অনেক তরুণকে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছেন।

তিনি বিবিসিকে বলেন, আহতদের একজনকে আমার গাড়ির বুটে ঢুকিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাই আমি। কারণ আমি চিন্তিত ছিলাম যে পুলিশ যদি আমাদের থামায় তাহলে সমস্যায় পড়ব আমরা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা তাকে থামিয়ে হাসপাতালের পরিচয়পত্র দেখে যেতে দেয় বলে জানান নিমা।

প্রায় ৯৬ ঘণ্টা ধরে, কোনো বাধা ছাড়াই, ঘুম ছাড়াই, এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ না করে আমরা অস্ত্রোপচার করেছিলাম। কেউ অভিযোগ করেনি।

তিনি বলেন, আমাদের সব পোশাক এবং হাসপাতালের গাউন রক্তে ভেজা ছিল। আমাদের বাইরে পড়ার পোশাক, অন্তর্বাস, সবকিছুই এই তরুণদের রক্তে ভেজা ছিল।

বিক্ষোভের সময় পায়ে এবং মুখে গুলি লেগেছিল এমন একজনের অস্ত্রোপচারের বর্ণনা দিয়েছেন নিমা।

তার থুতনি ভেদ করে একটা গুলি ওপরের চোয়াল দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল, বলেন তিনি।

নিমা আরও জানান, তার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অনেক তরুণের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে গুলি লেগেছে, যার কারণে সেসব অংশ কেটে ফেলার প্রয়োজন হয়েছে এবং স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছে তারা।

ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলমান এই পরিস্থিতিতে তিন হাজার ১০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, তবে তাদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য অথবা পথচারী যারা দাঙ্গাবাজদের হামলায় নিহত হয়েছেন বলেও দাবি করেছে তারা।

আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন শোকরিকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, এ সময়ে ১৩ হাজার অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, সৌভাগ্যবশত মানুষ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং হাসপাতালগুলোর ওপর আস্থা রাখে। চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে সকল আহত ব্যক্তিদের নিরপেক্ষভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এই আস্থার কারণে গত ছয়দিন ধরে বাড়িতে চিকিৎসা করা প্রায় তিন হাজার মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়েছে।

তেহরানের ফারাবি চক্ষু হাসপাতালের প্রধান ডা. কাসেম ফাখরাই আরেকটি আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ইসনাকে জানিয়েছেন, ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত চোখে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত ৭০০ রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছে। প্রায় ২০০ জনকে অন্যান্য হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।

৮ জানুয়ারির পরেই প্রায় সব রোগীকে ভর্তি করা হয়েছিল বলে জানান তিনি। সাইদ বিবিসিকে বলেন, সেন্ট্রাল শহর আরাকে বিক্ষোভ চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছোড়া গুলিতে তার এক বন্ধুর চোখ বিকৃত হয়ে যায়।

স্থানীয় চিকিৎসকরা তাকে তেহরানে একটি বিশেষজ্ঞ চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেছিলেন বলে জানান সাইদ। সেখানে পৌঁছানোর পর নার্সরা চোখে আঘাত পেয়েছেন এমন বিক্ষোভকারীদের হাসপাতালের পেছন দিক দিয়ে স্টাফ লিফট ব্যবহার করে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান।

সাইদের বন্ধু জানান, বিভিন্ন শহর থেকে আসা চোখে আঘাত পাওয়া এমন প্রায় ২০০ জন ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সাইদ বলেন, তার দুটি অপারেশন হয়েছিল। কিন্তু সার্জন তার কাছ থেকে কোনো খরচ নেননি।

তেহরানের এক স্বাস্থ্যসেবা কর্মী আরও জানিয়েছেন, চিকিৎসকরা মেডিকেল রেকর্ডে গুলির ক্ষত উল্লেখ করা এড়াতে চেষ্টা করছেন। কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ওপর ক্রমাগত নজর রাখছিল।

তেহরানে বিক্ষোভ চলার সময়ে পায়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সিনা তার ভাইকে হাসপাতালে নিয়ে যান।

সিনা বিবিসিকে বলেন, এটা ছিল যুদ্ধক্ষেত্রের হাসপাতালের মতো, এতো বেশি আহত ব্যক্তি ছিল যে কোনো কম্বল বা চিকিৎসা সরঞ্জাম ছিল না।

তিনি আরও বলেন, যখন আমি এক নার্সের কাছে আমার ভাইয়ের জন্য একটি কম্বল চাইলাম, তখন তিনি আমাকে বাড়ি থেকে একটি কম্বল আনতে বললেন। কারণ আহতদের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল এবং পর্যাপ্ত সরবরাহ ছিল না।

স্বাস্থ্য বীমা ব্যবহারের জন্য আসল পরিচয়পত্রের নম্বর দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না বলে জানান সিনা। যে কোনো মুহূর্তে নিরাপত্তা বাহিনী আমাদের বাড়িতে অভিযান চালাতে পারে, বলেন সিনা।

ছোট শহরগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিবিসি যেসব রিপোর্ট পেয়েছে সেগুলোতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী হাসপাতাল থেকে রোগীদের অপহরণ করেছে এবং তাদের আর দেখা যায়নি। মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, আহত বিক্ষোভকারীদের যেসব চিকিৎসকরা চিকিৎসা করেছেন এবং অন্যান্যরা এখন নিজেরাই নিরাপত্তা বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন।

ইরান হিউম্যান রাইটস বা আইএইচআর গত সপ্তাহে জানিয়েছে, ইরানে তাদের সূত্রগুলো কমপক্ষে পাঁচ চিকিৎসক এবং এক স্বেচ্ছাসেবককে গ্রেফতারের খবর দিয়েছে।

নরওয়েভিত্তিক এই সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, নিরাপত্তা সংস্থাগুলো চিকিৎসকদের গ্রেফতার এবং অস্থায়ী চিকিৎসা আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে অভিযান চালিয়ে জনসাধারণকে ভয় দেখানো এবং আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসায় বাধা দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে।

উত্তরাঞ্চলীয় শহর কাজভিনের এক সার্জন ডা. আলীরেজা গোলচিনির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো এই সপ্তাহে জানিয়েছে, আহত বিক্ষোভাকারীদের চিকিৎসার জন্য যখন তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, তখন নিরাপত্তা বাহিনী তার বাড়িতেই তাকে মারধর করেছে। তারা আরও জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে ‘মোহারেবেহ’, যার অর্থ ‘আল্লাহর বিরুদ্ধে শত্রুতা’ এই অভিযোগ আনা হয়েছে।

Tag :
জনপ্রিয়

মনিরুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ভিডিও ছড়িয়ে অপপ্রচার শনাক্ত: বাংলাফ্যাক্ট

দমন-পীড়নের যে লোহমর্ষক বর্ণনা দিলেন ইরানে বিক্ষোভকারীরা

Update Time : ১২:৪৯:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

মানুষ আমাদের সাহায্য করেছিল এবং আমরা একটি গাড়িতে উঠেছিলাম… আমি বলেছিলাম, আমাদের হাসপাতালে নিও না। তারা (ছদ্মনাম) নামের একজন বিক্ষোভকারী এবং তার বন্ধু ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইসফাহানে একটি বিক্ষোভে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই মোটরসাইকেলে করে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আসে এবং জনগণের উদ্দেশ্যে চিৎকার করতে শুরু করে। বিক্ষোভের সময় ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর চলা দমন-পীড়নের চিত্র এভাবে প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে বিবিসি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি বলেন, আমার বন্ধু নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সশস্ত্র সদস্যকে বলেন, আমাদের গুলি করেন না এবং সে তখনই আমাদেরকে লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটি গুলি চালায়। আমরা মাটিতে পড়ে যাই। আমাদের সব পোশাক রক্তে ভেজা ছিল।

তারা ও তার বন্ধুদের একজন অপরিচিত ব্যক্তির গাড়িতে তোলা হয়েছিলে। কিন্তু তারা বলছিল যে, গ্রেফতারের ঝুঁকির কারণে হাসপাতালে যেতে ভয় পাচ্ছিলেন তারা। সব গলিপথে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ছিলেন, তাই আমি সদর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা এক দম্পতিকে আমাদের ভেতরে ঢুকতে দিতে অনুরোধ করেছিলাম।

তারা জানান, প্রায় ভোর না হওয়া পর্যন্ত তারা ওই দম্পতির বাড়িতেই ছিলেন। এরপর তাদের পরিচিত এক চিকিৎসককে খুঁজে পান, যিনি তাদের পায়ের ক্ষত পরিষ্কার করে দেন।

তিনি বলেন, বাড়িতেই কিছু ক্ষত অপসারণ করতে সক্ষম হন এক সার্জন। কিন্তু তিনি তাদের সতর্ক করেছিলেন যে, এগুলো পরে অপসারণ করা যাবে না এবং আপনার শরীরে থেকে যাবে।

চলতি মাসে ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের ফলে কী পরিমাণ হতাহত হয়েছেন তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো জানা যায়নি। কারণ ইন্টারনেট বন্ধ এবং বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের রিপোর্টিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি বা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, তারা ইরানে চলমান আন্দোলনে ছয় হাজার ৩০১ জনের মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে।

যাদের মধ্যে পাঁচ হাজার ৯২৫ বিক্ষোভকারী, ১১২ শিশু, ৫০ পথচারী এবং ২১৪ সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। এই মানবাধিকার সংগঠনটি আরও ১৭ হাজার ৯১ জনের মৃত্যুর প্রতিবেদন অনুসন্ধান করছে।

কমপক্ষে আরও ১১ হাজার আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে এই সংগঠনটি ধারণা করছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিবিসিকে বলেছেন, গ্রেফতারের ভয়ে হাসপাতালে গিয়ে আঘাতের চিকিৎসা নেওয়া এড়িয়ে গেছেন তারা।

বাড়িতে গোপনে চিকিৎসা করে নিজেদের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা এ কারণে চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা বিবিসিকে আরও জানিয়েছেন, হাসপাতালগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনী উপস্থিত রয়েছে।

আহত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার জন্য মেডিকেল রেকর্ড তারা অনবরত পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন। তেহরানের এক সার্জন নিমা বলেন, ৮ জানুয়ারি যখন কর্তৃপক্ষ চলমান আন্দোলনে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করে, তখন তিনি কাজে যাওয়ার পথে রাস্তায় অনেক তরুণকে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছেন।

তিনি বিবিসিকে বলেন, আহতদের একজনকে আমার গাড়ির বুটে ঢুকিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাই আমি। কারণ আমি চিন্তিত ছিলাম যে পুলিশ যদি আমাদের থামায় তাহলে সমস্যায় পড়ব আমরা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা তাকে থামিয়ে হাসপাতালের পরিচয়পত্র দেখে যেতে দেয় বলে জানান নিমা।

প্রায় ৯৬ ঘণ্টা ধরে, কোনো বাধা ছাড়াই, ঘুম ছাড়াই, এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ না করে আমরা অস্ত্রোপচার করেছিলাম। কেউ অভিযোগ করেনি।

তিনি বলেন, আমাদের সব পোশাক এবং হাসপাতালের গাউন রক্তে ভেজা ছিল। আমাদের বাইরে পড়ার পোশাক, অন্তর্বাস, সবকিছুই এই তরুণদের রক্তে ভেজা ছিল।

বিক্ষোভের সময় পায়ে এবং মুখে গুলি লেগেছিল এমন একজনের অস্ত্রোপচারের বর্ণনা দিয়েছেন নিমা।

তার থুতনি ভেদ করে একটা গুলি ওপরের চোয়াল দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল, বলেন তিনি।

নিমা আরও জানান, তার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অনেক তরুণের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে গুলি লেগেছে, যার কারণে সেসব অংশ কেটে ফেলার প্রয়োজন হয়েছে এবং স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছে তারা।

ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলমান এই পরিস্থিতিতে তিন হাজার ১০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, তবে তাদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য অথবা পথচারী যারা দাঙ্গাবাজদের হামলায় নিহত হয়েছেন বলেও দাবি করেছে তারা।

আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন শোকরিকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, এ সময়ে ১৩ হাজার অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, সৌভাগ্যবশত মানুষ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং হাসপাতালগুলোর ওপর আস্থা রাখে। চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে সকল আহত ব্যক্তিদের নিরপেক্ষভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এই আস্থার কারণে গত ছয়দিন ধরে বাড়িতে চিকিৎসা করা প্রায় তিন হাজার মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়েছে।

তেহরানের ফারাবি চক্ষু হাসপাতালের প্রধান ডা. কাসেম ফাখরাই আরেকটি আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ইসনাকে জানিয়েছেন, ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত চোখে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত ৭০০ রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছে। প্রায় ২০০ জনকে অন্যান্য হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।

৮ জানুয়ারির পরেই প্রায় সব রোগীকে ভর্তি করা হয়েছিল বলে জানান তিনি। সাইদ বিবিসিকে বলেন, সেন্ট্রাল শহর আরাকে বিক্ষোভ চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছোড়া গুলিতে তার এক বন্ধুর চোখ বিকৃত হয়ে যায়।

স্থানীয় চিকিৎসকরা তাকে তেহরানে একটি বিশেষজ্ঞ চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেছিলেন বলে জানান সাইদ। সেখানে পৌঁছানোর পর নার্সরা চোখে আঘাত পেয়েছেন এমন বিক্ষোভকারীদের হাসপাতালের পেছন দিক দিয়ে স্টাফ লিফট ব্যবহার করে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান।

সাইদের বন্ধু জানান, বিভিন্ন শহর থেকে আসা চোখে আঘাত পাওয়া এমন প্রায় ২০০ জন ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সাইদ বলেন, তার দুটি অপারেশন হয়েছিল। কিন্তু সার্জন তার কাছ থেকে কোনো খরচ নেননি।

তেহরানের এক স্বাস্থ্যসেবা কর্মী আরও জানিয়েছেন, চিকিৎসকরা মেডিকেল রেকর্ডে গুলির ক্ষত উল্লেখ করা এড়াতে চেষ্টা করছেন। কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ওপর ক্রমাগত নজর রাখছিল।

তেহরানে বিক্ষোভ চলার সময়ে পায়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সিনা তার ভাইকে হাসপাতালে নিয়ে যান।

সিনা বিবিসিকে বলেন, এটা ছিল যুদ্ধক্ষেত্রের হাসপাতালের মতো, এতো বেশি আহত ব্যক্তি ছিল যে কোনো কম্বল বা চিকিৎসা সরঞ্জাম ছিল না।

তিনি আরও বলেন, যখন আমি এক নার্সের কাছে আমার ভাইয়ের জন্য একটি কম্বল চাইলাম, তখন তিনি আমাকে বাড়ি থেকে একটি কম্বল আনতে বললেন। কারণ আহতদের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল এবং পর্যাপ্ত সরবরাহ ছিল না।

স্বাস্থ্য বীমা ব্যবহারের জন্য আসল পরিচয়পত্রের নম্বর দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না বলে জানান সিনা। যে কোনো মুহূর্তে নিরাপত্তা বাহিনী আমাদের বাড়িতে অভিযান চালাতে পারে, বলেন সিনা।

ছোট শহরগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিবিসি যেসব রিপোর্ট পেয়েছে সেগুলোতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী হাসপাতাল থেকে রোগীদের অপহরণ করেছে এবং তাদের আর দেখা যায়নি। মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, আহত বিক্ষোভকারীদের যেসব চিকিৎসকরা চিকিৎসা করেছেন এবং অন্যান্যরা এখন নিজেরাই নিরাপত্তা বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন।

ইরান হিউম্যান রাইটস বা আইএইচআর গত সপ্তাহে জানিয়েছে, ইরানে তাদের সূত্রগুলো কমপক্ষে পাঁচ চিকিৎসক এবং এক স্বেচ্ছাসেবককে গ্রেফতারের খবর দিয়েছে।

নরওয়েভিত্তিক এই সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, নিরাপত্তা সংস্থাগুলো চিকিৎসকদের গ্রেফতার এবং অস্থায়ী চিকিৎসা আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে অভিযান চালিয়ে জনসাধারণকে ভয় দেখানো এবং আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসায় বাধা দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে।

উত্তরাঞ্চলীয় শহর কাজভিনের এক সার্জন ডা. আলীরেজা গোলচিনির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো এই সপ্তাহে জানিয়েছে, আহত বিক্ষোভাকারীদের চিকিৎসার জন্য যখন তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, তখন নিরাপত্তা বাহিনী তার বাড়িতেই তাকে মারধর করেছে। তারা আরও জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে ‘মোহারেবেহ’, যার অর্থ ‘আল্লাহর বিরুদ্ধে শত্রুতা’ এই অভিযোগ আনা হয়েছে।