০৮:৪৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ৩০ চৈত্র ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

মহামারী করোনায় পাল্টানো জীবন

  • Update Time : ০৩:০০:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৪
  • ৬২ Time View

মেহেরপুর অফিস: মেহেরপুর সদর উপজেলার আমঝুপি গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা রিমন শেখ কুষ্টিয়া সরকারী কলেজে ২০১৯ সালে অর্থনীতিতে অনার্স করছিলেন। শিক্ষার্থী থাকা কালিন সময়ে সেখানে টিউশনি করে থাকা খাওয়া ও লেখা পড়ার খরচ যোগাতেন নিজেই। কোন মাসে খরচ কম হলে টিউশনির টাকা মাঝে মাঝে কিছু জমাও হতো। তবে হঠাৎ ঐ বছরে মহামারী করোনা রিমন শেখের জীবন সব ওলট পালট করে দেয়। টিউশনি বন্ধ হয়ে যায়। উপায়ান্তর না পেয়ে নিজ বাড়ি আমঝুপিতে চলে আসেন। টিউশুশনি না থাকায় রোজগারের নতুন পথ খুজতে শুরু করেন। করোনায় সব লকডাউন থাকায় বাড়িতে বসেই লেখাপাড়া চালাতে থাকেন। এরই মধ্যেই জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শে জমাকৃত টিউশনির মাত্র সাড়ে ৩ হাজার টাকায় প্রথম স্বল্প পরিসরে ভার্মি কম্পোস্ট সার তৈরির প্রজেক্ট হাতে নেন। তার সেই প্রজেক্ট ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এখন তার ফার্মটি ২৫ লক্ষ টাকার প্রজেক্টে রুপ লাভ করেছে। এই কেচোঁ কম্পোস্ট সার থেকেই সব খরচ বাদে মাসে লাখ টাকা আয় হচ্ছে তার। এরই মধ্যে কুষ্টিয়া সরকারী কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স মাস্টার্স শেষ করেছেন। এখন চাকরির পিছে না ঘুরে অন্যকে তার প্রজেক্টে কাজ করার সুযোগ করে দিচ্ছেন। জৈব সারে মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি ও ফসল উৎপাদনের প্রয়োজনীয় ১৬টি উপাদান বিদ্যমান আছে। উদ্যেক্তা ও কৃষকরা জানান, রাসায়নিক সার একবার ব্যাবহার করে পরের বার তার দিগুন সার প্রয়োগ না করলে ফসল ভাল হয়না। জৈব সার একবার ব্যাবহার করলে তার সুফল অন্তত দুবার পাওয়া যায়। জৈব সারে জমির স্বাস্থ্য ও প্রাণ সতেজ থাকে। রাসায়নিক সার ব্যাবহারে তাৎক্ষনিক সুফল পাওয়া যায়। জৈবসারে দীর্ঘস্থায়ীভাবে মাটির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি পায়। ফলে কৃষকরা এখন জৈব সারের দিকে ঝুঁকছে। তাই রিমনের তৈরী ভার্মি কম্পোস্ট সার তার বাড়িতে থেকেই কৃষকরা কিনে নিয়ে যাচ্ছে। আর রিমন মহামারী করোনায় টিউশনি চলে যাওয়ায় হতাশ না হয়ে জীবন পাল্টে এখন মাসে লাখ টাকা আয় করছে বাড়িতে বসে। রিমন যায়যায়দিনকে জানায়, করোনায় কুষ্টিয়াতে টিউশনি হারিয়ে হাতাশ না হয়ে আয় রোজগারের পথ খুঁজতে থাকি। বাড়ির পাশেই বাবার এক বিঘার একটি আম বাগান আছে। ওই বাগানে টিউশুনির সাড়ে তিনহাজার টাকার কেঁচো কিনে ভার্মি কম্পোস্ট সার তৈরী করতে শুরু করি। ফার্মের নাম দিই “সোনার বাংলা এগ্রো”। আমি ছাত্র হওয়ায় খবর পেয়ে কৃষি বিভাগের লোকজন সার তৈরীর নানা কৌশল শিক্ষা দিতে থাকে। আমিও দক্ষতার সহিত তা রপ্ত করে জৈব সারের যে ধরনের উপাদান থাকা দরকার সেই ভাবে ভার্মি কম্পোস্ট সার তৈরীতে সক্ষম হই। সম্প্রতি সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন আমার সার ঢাকায় ল্যাব টেস্টে পাঠিয়েছিলেন। টেস্টে এই সারে সকল উপাদান বিদ্যমান রয়েছে। এখন সরকার আমাকে সারগুলো মোড়কে প্যাকেজিং করে বিক্রি করার অনুমোতি দিলে বাজারে এর চাহীদা আরো বাড়তো। আমার মত নতুন নতুন আরো উদ্যোক্তা তৈরী হতো। তাহলে দেশে রাসায়নিক সারের চাহীদা কমে যেত। ভোক্তারাও ক্যমিক্যলে ও বিষাক্ত উপাদান প্রয়োগে উৎপাদিত ফসল থেকে মুক্তি পেত। কমে যেত কৃষকের ফসল উৎপাদন খরচ। রিমনের পিতা জমিরুল ইসলাম বলেন, আমি এখন আমার ছেলের প্রজেক্ট দেখাশুনা করি। ছেলে আমাকে আর বাইরে কাজ করতে দেয়না।এখানে এখন চারজন নিয়মিত লেবার আছে। তাদের কাজে আমিও সহযোগিতা করি। প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা লেবার খরচ, ৫০ হাজার টাকার গোবর ক্রয় ও ১০ হাজার টাকার বস্তা ক্রয় করা লাগে। বর্তমানে প্রতিমাসে ২৪ টন ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন হচ্ছে। প্রতি টন সার বিক্রি হচ্ছে ১০ হাজার টাকায়। এছাড়া কেঁচো বিক্রি হচ্ছে চার হাজার টাকা কেজি। সব খরচ বাদ দিলেও মাসে লাখ টাকা আয় হচ্ছে। ছেলের এখন টার্গেট গোবর ক্রয় না করে গরু কিনবে। টাকা জমাচ্ছে। গাভি ও ষাড় গরু কিনে আলাদা ফার্ম করা হবে। সরকারী সহায়তা পেলে খুব দ্রতই ফার্ম করা সম্ভব হবে। নতুন উদ্যোক্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, রিমনের সফলতা দেখে ভার্মি কম্পোস্ট জৈব সার প্রস্তত করার আমি প্রজেক্ট গড়েছি। আশা করছি আর ৩-৪ মাস পর থেকে সুফল পেতে শুরু করবো। কৃষক আল মামুন বলেন, জৈব সারে জমির প্রাণ সতেজ থাকে। রাসায়নিক সার ব্যাবহারে তাৎক্ষনিক সুফল পাওয়া যায়। জৈব সারে দীর্ঘস্থায়ীভাবে মাটির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি পায়। ফলে কৃষকরা এখন জৈব সারের দিকে ঝুঁকছে। সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, মেহেরপুর কৃষিতে সমৃদ্ধ একটি জেলা। জমির স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য জৈব সারের কোন বিকল্প নেই। এই সার ভর্মি কম্পোস্ট হলে জমির শক্তি ১০ গুণ বেড়ে যায়। এ সার ব্যবহারে মাটির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে রাসায়নিক সার ব্যাবহারের মাত্রা কমানো যায়। বাণিজ্যিক ভাবে এই সার উৎপাদন ও বিক্রি করে ভাগ্যের আমুল পরিবর্তন করেছেন শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তা রিমন শেখ। তার এই সাফল্যে এলাকার নতুন নতুন তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতীকভাবে স্বাবলম্বি হতে অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে। রিমনের মত তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরে মেহেরপুরের কৃষি এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা তাদের সব ধরনের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি।

Tag :
জনপ্রিয়

time tesst post

মহামারী করোনায় পাল্টানো জীবন

Update Time : ০৩:০০:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

মেহেরপুর অফিস: মেহেরপুর সদর উপজেলার আমঝুপি গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা রিমন শেখ কুষ্টিয়া সরকারী কলেজে ২০১৯ সালে অর্থনীতিতে অনার্স করছিলেন। শিক্ষার্থী থাকা কালিন সময়ে সেখানে টিউশনি করে থাকা খাওয়া ও লেখা পড়ার খরচ যোগাতেন নিজেই। কোন মাসে খরচ কম হলে টিউশনির টাকা মাঝে মাঝে কিছু জমাও হতো। তবে হঠাৎ ঐ বছরে মহামারী করোনা রিমন শেখের জীবন সব ওলট পালট করে দেয়। টিউশনি বন্ধ হয়ে যায়। উপায়ান্তর না পেয়ে নিজ বাড়ি আমঝুপিতে চলে আসেন। টিউশুশনি না থাকায় রোজগারের নতুন পথ খুজতে শুরু করেন। করোনায় সব লকডাউন থাকায় বাড়িতে বসেই লেখাপাড়া চালাতে থাকেন। এরই মধ্যেই জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শে জমাকৃত টিউশনির মাত্র সাড়ে ৩ হাজার টাকায় প্রথম স্বল্প পরিসরে ভার্মি কম্পোস্ট সার তৈরির প্রজেক্ট হাতে নেন। তার সেই প্রজেক্ট ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এখন তার ফার্মটি ২৫ লক্ষ টাকার প্রজেক্টে রুপ লাভ করেছে। এই কেচোঁ কম্পোস্ট সার থেকেই সব খরচ বাদে মাসে লাখ টাকা আয় হচ্ছে তার। এরই মধ্যে কুষ্টিয়া সরকারী কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স মাস্টার্স শেষ করেছেন। এখন চাকরির পিছে না ঘুরে অন্যকে তার প্রজেক্টে কাজ করার সুযোগ করে দিচ্ছেন। জৈব সারে মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি ও ফসল উৎপাদনের প্রয়োজনীয় ১৬টি উপাদান বিদ্যমান আছে। উদ্যেক্তা ও কৃষকরা জানান, রাসায়নিক সার একবার ব্যাবহার করে পরের বার তার দিগুন সার প্রয়োগ না করলে ফসল ভাল হয়না। জৈব সার একবার ব্যাবহার করলে তার সুফল অন্তত দুবার পাওয়া যায়। জৈব সারে জমির স্বাস্থ্য ও প্রাণ সতেজ থাকে। রাসায়নিক সার ব্যাবহারে তাৎক্ষনিক সুফল পাওয়া যায়। জৈবসারে দীর্ঘস্থায়ীভাবে মাটির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি পায়। ফলে কৃষকরা এখন জৈব সারের দিকে ঝুঁকছে। তাই রিমনের তৈরী ভার্মি কম্পোস্ট সার তার বাড়িতে থেকেই কৃষকরা কিনে নিয়ে যাচ্ছে। আর রিমন মহামারী করোনায় টিউশনি চলে যাওয়ায় হতাশ না হয়ে জীবন পাল্টে এখন মাসে লাখ টাকা আয় করছে বাড়িতে বসে। রিমন যায়যায়দিনকে জানায়, করোনায় কুষ্টিয়াতে টিউশনি হারিয়ে হাতাশ না হয়ে আয় রোজগারের পথ খুঁজতে থাকি। বাড়ির পাশেই বাবার এক বিঘার একটি আম বাগান আছে। ওই বাগানে টিউশুনির সাড়ে তিনহাজার টাকার কেঁচো কিনে ভার্মি কম্পোস্ট সার তৈরী করতে শুরু করি। ফার্মের নাম দিই “সোনার বাংলা এগ্রো”। আমি ছাত্র হওয়ায় খবর পেয়ে কৃষি বিভাগের লোকজন সার তৈরীর নানা কৌশল শিক্ষা দিতে থাকে। আমিও দক্ষতার সহিত তা রপ্ত করে জৈব সারের যে ধরনের উপাদান থাকা দরকার সেই ভাবে ভার্মি কম্পোস্ট সার তৈরীতে সক্ষম হই। সম্প্রতি সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন আমার সার ঢাকায় ল্যাব টেস্টে পাঠিয়েছিলেন। টেস্টে এই সারে সকল উপাদান বিদ্যমান রয়েছে। এখন সরকার আমাকে সারগুলো মোড়কে প্যাকেজিং করে বিক্রি করার অনুমোতি দিলে বাজারে এর চাহীদা আরো বাড়তো। আমার মত নতুন নতুন আরো উদ্যোক্তা তৈরী হতো। তাহলে দেশে রাসায়নিক সারের চাহীদা কমে যেত। ভোক্তারাও ক্যমিক্যলে ও বিষাক্ত উপাদান প্রয়োগে উৎপাদিত ফসল থেকে মুক্তি পেত। কমে যেত কৃষকের ফসল উৎপাদন খরচ। রিমনের পিতা জমিরুল ইসলাম বলেন, আমি এখন আমার ছেলের প্রজেক্ট দেখাশুনা করি। ছেলে আমাকে আর বাইরে কাজ করতে দেয়না।এখানে এখন চারজন নিয়মিত লেবার আছে। তাদের কাজে আমিও সহযোগিতা করি। প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা লেবার খরচ, ৫০ হাজার টাকার গোবর ক্রয় ও ১০ হাজার টাকার বস্তা ক্রয় করা লাগে। বর্তমানে প্রতিমাসে ২৪ টন ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন হচ্ছে। প্রতি টন সার বিক্রি হচ্ছে ১০ হাজার টাকায়। এছাড়া কেঁচো বিক্রি হচ্ছে চার হাজার টাকা কেজি। সব খরচ বাদ দিলেও মাসে লাখ টাকা আয় হচ্ছে। ছেলের এখন টার্গেট গোবর ক্রয় না করে গরু কিনবে। টাকা জমাচ্ছে। গাভি ও ষাড় গরু কিনে আলাদা ফার্ম করা হবে। সরকারী সহায়তা পেলে খুব দ্রতই ফার্ম করা সম্ভব হবে। নতুন উদ্যোক্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, রিমনের সফলতা দেখে ভার্মি কম্পোস্ট জৈব সার প্রস্তত করার আমি প্রজেক্ট গড়েছি। আশা করছি আর ৩-৪ মাস পর থেকে সুফল পেতে শুরু করবো। কৃষক আল মামুন বলেন, জৈব সারে জমির প্রাণ সতেজ থাকে। রাসায়নিক সার ব্যাবহারে তাৎক্ষনিক সুফল পাওয়া যায়। জৈব সারে দীর্ঘস্থায়ীভাবে মাটির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি পায়। ফলে কৃষকরা এখন জৈব সারের দিকে ঝুঁকছে। সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, মেহেরপুর কৃষিতে সমৃদ্ধ একটি জেলা। জমির স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য জৈব সারের কোন বিকল্প নেই। এই সার ভর্মি কম্পোস্ট হলে জমির শক্তি ১০ গুণ বেড়ে যায়। এ সার ব্যবহারে মাটির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে রাসায়নিক সার ব্যাবহারের মাত্রা কমানো যায়। বাণিজ্যিক ভাবে এই সার উৎপাদন ও বিক্রি করে ভাগ্যের আমুল পরিবর্তন করেছেন শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তা রিমন শেখ। তার এই সাফল্যে এলাকার নতুন নতুন তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতীকভাবে স্বাবলম্বি হতে অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে। রিমনের মত তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরে মেহেরপুরের কৃষি এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা তাদের সব ধরনের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি।