জীবিকার প্রয়োজনে প্রত্যেক মানুষ ছোট বড় কাজ করে থাকেন। কেউ জীবন যুদ্ধে লড়াই করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছান, আবার কেউ হেরে যান। এরপরও চেষ্টা থেমে থাকে না। লড়াই করে দু’বেলা দু’মুঠো ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকার জন্য এক হাত নিয়েই রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন মো. মানিক মিয়া (৪৮)। জীবন যুদ্ধে পঙ্গুত্বের কাছে হার মানেননি তিনি।
প্রায় ২২ বছর ধরে এক হাতে রিকশার চাকা ঘুরিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মানিক। এই চাকা কখনো কখনো থেমে থাকলেও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে বয়ে চলছে তার জীবন। মানিক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের কাইজ বাড়ি (সাতপাড়া) গ্রামের বাসিন্দা পিছন মিয়ার ছেলে।
মানিক জানান, ছোট বেলা থেকেই তার পারিবারিক অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। তার বাবা একজন দিনমজুর ছিলেন। তাই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও লেখাপড়া করতে পারেননি। দৈনিক আয়ের উপর চলতো তাদের সংসার। তার বয়স যখন ১২-১৩ বছর সংসারের হাল ধরতে আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশনে একটি হোটেলে দৈনিক মজুরিতে কাজ শুরু করেন। অসাবধানতাবশত রেললাইন পারাপার হতে গিয়ে হঠাৎ ট্রেনের ইঞ্জিনের নিচে পড়ে তার বাম হাত কাটা পড়ে।
এক হাতে রিকশা চালচ্ছেন মানিক মিয়া
এ দুর্ঘটনার পর থেকে বেশ কয়েক বছর তিনি আর কোনো কাজকর্ম করতে পারেননি। খুব কষ্টে চলতে হয়েছে। একপর্যায়ে রিকশা চালানোর পেশা বেছে নেন। প্রথমে ভাড়ায় চালিত একটি রিকশা নিয়ে জীবন যুদ্ধে নেমে পড়েন। প্রথম প্রথম এক হাত দিয়ে রিকশা চালতে তার খুবই কষ্ট হতো। যাত্রীরাও তার রিকশায় উঠতে ভয় পেতেন। তবে আস্তে আস্তে রিকশা চালানোয় হাত পাকা হয়ে উঠায় যাত্রী বাড়তে থাকে। এখন তিনি এক হাত অর্থাৎ শুধু ডান হাতেই দক্ষতার সঙ্গে রিকশা চালাচ্ছেন।
মানিক জানান, প্রতিদিন সকাল থেকে পৌরশহরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রিকশা চালিয়ে পরিবারের সদস্যদের মুখে ভাত তুলে দিচ্ছেন। সকাল-সন্ধ্যা রিকশা চালিয়ে দৈনিক ৫শ’ টাকার উপর তার আয় হয় তার। আগে খুবই কষ্ট করে প্যাডেল চালিয়ে রিকশা চালাতে হতো। কিন্তু এখন ব্যাটারি চালিত রিকশা হওয়ায় কষ্ট কমে এসেছে।
১৮ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন। বর্তমানে তার পরিবারে স্ত্রী, দুই ছেলে তিন মেয়েসহ সাত সদস্য রয়েছেন। এরমধ্যে এক মেয়েকে বিবাহ দিয়েছেন। এক মেয়ে মাদরাসায় পড়ছে। সরকারের দেওয়া প্রতিবন্ধী সহায়তা ভাতা পাচ্ছেন।
রিকশাযাত্রী মো. ফুরকান মিয়া বলেন, দুর্ঘটনার ভয়ে প্রথম প্রথম তার রিকশায় উঠতে চাইতাম না। কারণ তিনি এক হাত দিয়ে রিকশা চালান। তবে এক হাত দিয়ে রিকশা চালালেও কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। এখন আর তার রিকশা চড়তে কোনো প্রকার ভয় পাই না। তাকে দেখলে অন্য রিকশায় না উঠে তারটাতেই ওঠেন বলেও জানান তিনি।
উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকার অসহায় লোকদের সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন কাজ করছে। মানিক জীবন যুদ্ধে দিন রাত পরিশ্রম করছেন। তাকে নিয়মিত ভাতা দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. জালাল উদ্দিন বলেন, মানিক যে কর্মটি করছেন তা আসলেই কঠিন কাজ। তার বিষয়টি অবগত আছি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।




















