১২:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৯ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কলম্বিয়ায় ঢুকছেন ভেনেজুয়েলাবাসী: স্বস্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আতঙ্ক

  • Update Time : ০২:৪৪:২৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • 37

ঢাকা, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬  : প্রতিবেশী কলম্বিয়ায় যাওয়ার একটি সেতু দিয়ে ভেনেজুয়েলা ছাড়ছেন বিদেশে বসবাস ও কাজ করা নাগরিকরা। ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা এই মানুষের মুখে উৎকণ্ঠা। উৎসবের ছুটি কাটিয়ে দেশে ফিরে তারা প্রিয়জনদের পেছনে রেখে যাচ্ছেন। সেই ছুটি বিষাদে ভরে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলায়।

কলম্বিয়ার ভিলা দেল রোসারিও থেকে বার্তাসংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।

বামপন্থি নেতা নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ক্ষমতাচ্যুত করায় অনেকেই খুশি। তবে সামনে কী হবে—এই প্রশ্নে তাদের দুশ্চিন্তা কাটছে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে কার্যত ভেনেজুয়েলার দায়িত্বে আছেন বলে দাবি করেছেন। এরই মধ্যে সোমবার দেশটি অন্তর্বর্তী নেতা হিসেবে মাদুরোর ঘনিষ্ঠ একজন দায়িত্ব নিয়েছেন।

সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক সেতুতে হেঁটে পার হতে জড়ো হন অনেকে। তাদেরই একজন ৫৭ বছর বয়সী ভেনেজুয়েলান স্থপতি এভেলিন কার্দেনাস। নয় বছর ধরে তিনি চিলিতে থাকেন। চাকার ওপর বড় একটি স্যুটকেস টানতে টানতে সেতু পার হচ্ছিলেন। পেছনে ছিলেন তার স্বামী।

কলম্বিয়ায় পা রাখতেই তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।

তিনি এএফপিকে বলেন, ‘সব ভেনেজুয়েলাবাসীই খুশি। কিন্তু আমরা প্রকাশ্যে তা বলতে পারি না। সেতু পার হয়েছি বলেই এখন বলতে পারছি।’

ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ওয়াশিংটনের নির্দেশ না মানলে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের পরিণতিও মাদুরোর মতো বা তার চেয়েও খারাপ হতে পারে।

অনেকের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের আরো হস্তক্ষেপ হতে পারে। পাশাপাশি যারা মাদুরো অপসারণে সমর্থন দিচ্ছেন বলে চিহ্নিত হবেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে পারে অবশিষ্ট ‘চাভিস্তা’ প্রশাসন (ভেনেজুয়েলার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ ও তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ  দ্বারা প্রভাবিত সরকার বা শাসনব্যবস্থা)—এমন ভয়ও কাজ করছে।

কার্দেনাস ভেনেজুয়েলার সান ক্রিস্তোবাল শহরের বাসিন্দা। বড়দিন ও নববর্ষে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে তিনি দেশে ফিরেছিলেন।

তখনই তিনি ছিলেন দেশে, যখন শনিবার ভোরে কারাকাস বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারের দাবি, ওই ঘটনায় ৫৫ জন ভেনেজুয়েলান ও কিউবান সেনা নিহত হন।

কার্দেনাস বলেন, ‘আমরা এখনও ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না।’

তিনি বাস ও বিমানে চড়ে সান্তিয়াগো ফেরার পরিকল্পনা করছেন।

দীর্ঘমেয়াদে তিনি ‘ভালো কিছুর’ আশা দেখছেন। তার বিশ্বাস, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অন্ধকার থেকে ভেনেজুয়েলা একদিন বেরিয়ে আসবে।

তবে আপাতত তিনি চান, অন্য কোথাও থাকতে।

কলম্বিয়া যে সীমান্ত এলাকায় সেনা ও সাঁজোয়া যান মোতায়েন করেছে, সেই সীমান্তের দুই পাশেই কাজ করেন ৫৫ বছর বয়সী শিক্ষক ওয়াল্টার মনসালভে। তিনি বলেন, তিনি ‘স্তব্ধ’ হয়ে গেছেন।

তিনি বলেন, ‘যে কারণই থাকুক, এমনভাবে এটা কখনোই হওয়া উচিত ছিল না।’ যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে তিনি তুলনা করেন, ‘কেউ হঠাৎ করে আপনার ঘরে ঢুকে পড়ার’ সঙ্গে।

মনসালভের মতোই অনেক প্রতিবেশী ও স্বজনের মনে এখন ভয়—এর পর কী হতে যাচ্ছে।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি বুঝি না জাতিসংঘ আসলে কী করে। এসব আন্তর্জাতিক সংস্থা আছে, কিন্তু এমন পরিস্থিতি ঠেকাতে পারে না।’

সীমান্তের কলম্বীয়ার অংশে কম দামে কেনাকাটা করতে নিয়মিত কুকুতা শহরে যাতায়াত করা অনেক ভেনেজুয়েলাবাসী ভয়ের কারণে কোনো মতামত দিতে চাননি।

তাদের একজন শুধু বলেন, ভেনেজুয়েলার দিকে ‘পরিস্থিতি অদ্ভুত।’

১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থী কাইলিগ হিমেনেস বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের ফিরে আসার আশা করছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘এখন আমরা ভেনিয়র্ক।’ ভেনেজুয়েলা চালানোর কথা যুক্তরাষ্ট্র বলছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের দিকেই তিনি ইঙ্গিত করেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রায় ৮০ লাখ ভেনেজুয়েলাবাসী দেশ ছেড়েছেন বলে ধারণা করা হয়। তাদের বেশিরভাগই বসবাস করছেন কলম্বিয়ায়।

সেতু এলাকা জুড়ে ছিল সাংবাদিকদের ভিড়ও। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে তারা এসেছেন এ বছর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক খবরটি কাভার করতে।

মাইক্রোফোন, কেবল আর ট্রাইপডে বসানো ক্যামেরার জটের মধ্যে কয়েক দিন অপেক্ষার পর অনেকেই আশা হারাতে শুরু করেছেন। ভেনেজুয়েলায় ঢোকার অনুমতি তারা আদৌ পাবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। দেশটি ভেনেজুয়েলায় জন্ম নেওয়া সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও ভিসা বাধ্যতামূলক করেছে।

ভেনেজুয়েলার সাংবাদিক ইউনিয়ন জানিয়েছে, মঙ্গলবার নতুন নির্বাচিত পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশনের আগের দিন ১৬ জন গণমাধ্যমকর্মীকে আটক করা হয়। ওই অধিবেশনেই রদ্রিগেজ শপথ নেন। পরে সবাইকে মুক্তি দেওয়া হয়।

Tag :
জনপ্রিয়

কলম্বিয়ায় ঢুকছেন ভেনেজুয়েলাবাসী: স্বস্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আতঙ্ক

Update Time : ০২:৪৪:২৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৬

ঢাকা, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬  : প্রতিবেশী কলম্বিয়ায় যাওয়ার একটি সেতু দিয়ে ভেনেজুয়েলা ছাড়ছেন বিদেশে বসবাস ও কাজ করা নাগরিকরা। ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা এই মানুষের মুখে উৎকণ্ঠা। উৎসবের ছুটি কাটিয়ে দেশে ফিরে তারা প্রিয়জনদের পেছনে রেখে যাচ্ছেন। সেই ছুটি বিষাদে ভরে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলায়।

কলম্বিয়ার ভিলা দেল রোসারিও থেকে বার্তাসংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।

বামপন্থি নেতা নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ক্ষমতাচ্যুত করায় অনেকেই খুশি। তবে সামনে কী হবে—এই প্রশ্নে তাদের দুশ্চিন্তা কাটছে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে কার্যত ভেনেজুয়েলার দায়িত্বে আছেন বলে দাবি করেছেন। এরই মধ্যে সোমবার দেশটি অন্তর্বর্তী নেতা হিসেবে মাদুরোর ঘনিষ্ঠ একজন দায়িত্ব নিয়েছেন।

সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক সেতুতে হেঁটে পার হতে জড়ো হন অনেকে। তাদেরই একজন ৫৭ বছর বয়সী ভেনেজুয়েলান স্থপতি এভেলিন কার্দেনাস। নয় বছর ধরে তিনি চিলিতে থাকেন। চাকার ওপর বড় একটি স্যুটকেস টানতে টানতে সেতু পার হচ্ছিলেন। পেছনে ছিলেন তার স্বামী।

কলম্বিয়ায় পা রাখতেই তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।

তিনি এএফপিকে বলেন, ‘সব ভেনেজুয়েলাবাসীই খুশি। কিন্তু আমরা প্রকাশ্যে তা বলতে পারি না। সেতু পার হয়েছি বলেই এখন বলতে পারছি।’

ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ওয়াশিংটনের নির্দেশ না মানলে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের পরিণতিও মাদুরোর মতো বা তার চেয়েও খারাপ হতে পারে।

অনেকের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের আরো হস্তক্ষেপ হতে পারে। পাশাপাশি যারা মাদুরো অপসারণে সমর্থন দিচ্ছেন বলে চিহ্নিত হবেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে পারে অবশিষ্ট ‘চাভিস্তা’ প্রশাসন (ভেনেজুয়েলার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ ও তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ  দ্বারা প্রভাবিত সরকার বা শাসনব্যবস্থা)—এমন ভয়ও কাজ করছে।

কার্দেনাস ভেনেজুয়েলার সান ক্রিস্তোবাল শহরের বাসিন্দা। বড়দিন ও নববর্ষে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে তিনি দেশে ফিরেছিলেন।

তখনই তিনি ছিলেন দেশে, যখন শনিবার ভোরে কারাকাস বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারের দাবি, ওই ঘটনায় ৫৫ জন ভেনেজুয়েলান ও কিউবান সেনা নিহত হন।

কার্দেনাস বলেন, ‘আমরা এখনও ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না।’

তিনি বাস ও বিমানে চড়ে সান্তিয়াগো ফেরার পরিকল্পনা করছেন।

দীর্ঘমেয়াদে তিনি ‘ভালো কিছুর’ আশা দেখছেন। তার বিশ্বাস, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অন্ধকার থেকে ভেনেজুয়েলা একদিন বেরিয়ে আসবে।

তবে আপাতত তিনি চান, অন্য কোথাও থাকতে।

কলম্বিয়া যে সীমান্ত এলাকায় সেনা ও সাঁজোয়া যান মোতায়েন করেছে, সেই সীমান্তের দুই পাশেই কাজ করেন ৫৫ বছর বয়সী শিক্ষক ওয়াল্টার মনসালভে। তিনি বলেন, তিনি ‘স্তব্ধ’ হয়ে গেছেন।

তিনি বলেন, ‘যে কারণই থাকুক, এমনভাবে এটা কখনোই হওয়া উচিত ছিল না।’ যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে তিনি তুলনা করেন, ‘কেউ হঠাৎ করে আপনার ঘরে ঢুকে পড়ার’ সঙ্গে।

মনসালভের মতোই অনেক প্রতিবেশী ও স্বজনের মনে এখন ভয়—এর পর কী হতে যাচ্ছে।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি বুঝি না জাতিসংঘ আসলে কী করে। এসব আন্তর্জাতিক সংস্থা আছে, কিন্তু এমন পরিস্থিতি ঠেকাতে পারে না।’

সীমান্তের কলম্বীয়ার অংশে কম দামে কেনাকাটা করতে নিয়মিত কুকুতা শহরে যাতায়াত করা অনেক ভেনেজুয়েলাবাসী ভয়ের কারণে কোনো মতামত দিতে চাননি।

তাদের একজন শুধু বলেন, ভেনেজুয়েলার দিকে ‘পরিস্থিতি অদ্ভুত।’

১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থী কাইলিগ হিমেনেস বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের ফিরে আসার আশা করছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘এখন আমরা ভেনিয়র্ক।’ ভেনেজুয়েলা চালানোর কথা যুক্তরাষ্ট্র বলছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের দিকেই তিনি ইঙ্গিত করেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রায় ৮০ লাখ ভেনেজুয়েলাবাসী দেশ ছেড়েছেন বলে ধারণা করা হয়। তাদের বেশিরভাগই বসবাস করছেন কলম্বিয়ায়।

সেতু এলাকা জুড়ে ছিল সাংবাদিকদের ভিড়ও। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে তারা এসেছেন এ বছর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক খবরটি কাভার করতে।

মাইক্রোফোন, কেবল আর ট্রাইপডে বসানো ক্যামেরার জটের মধ্যে কয়েক দিন অপেক্ষার পর অনেকেই আশা হারাতে শুরু করেছেন। ভেনেজুয়েলায় ঢোকার অনুমতি তারা আদৌ পাবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। দেশটি ভেনেজুয়েলায় জন্ম নেওয়া সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও ভিসা বাধ্যতামূলক করেছে।

ভেনেজুয়েলার সাংবাদিক ইউনিয়ন জানিয়েছে, মঙ্গলবার নতুন নির্বাচিত পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশনের আগের দিন ১৬ জন গণমাধ্যমকর্মীকে আটক করা হয়। ওই অধিবেশনেই রদ্রিগেজ শপথ নেন। পরে সবাইকে মুক্তি দেওয়া হয়।