জানা যায়, বৃদ্ধ মতিয়ার রহমান (৭০) ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ সুগার মিলের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী। চাকরি করে পাঁচ বিঘা জমি ক্রয় করেন যশোরের চৌগাছা উপজেলার পাতিবিলা ইউপির চৌগাছা-কোটচাঁদপুর সড়ক সংলগ্ন দেবীপুর গ্রামে। তিন মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে ছেলে শারীরিকভাবে কিছুটা দুর্বল হওয়ায় ১৯৯১ সালে নাবালক ছেলে আব্দুল হামিদের নামে দানসত্ত্ব দলিল করে দেন জমির সিংহভাগ। পরে পৈত্রিক জমিরও বেশিরভাগ ছেলের নামে তিনি লিখে দেন। বাড়িসহ মাত্র ৫ শতক জমি রাখেন নিজের নামে।
বৃদ্ধের স্ত্রী মারা গেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। সম্প্রতি লিখে দেয়া সেই জমি ছেলে আব্দুল হামিদের নামে নামজারিও সম্পন্ন হয়। এরইমধ্যে ছেলে আব্দুল হামিদ বাবাকে বলেন, আমি শ্বশুরবাড়ি এলাকায় জমি বর্গা চাষ করবো। তোমার জমি বন্ধক রেখে টাকা দাও।
বৃদ্ধ বাবা মতিয়ার রহমান নিজের কয়েক বিঘা জমি বন্ধক রেখে ছেলেকে ২ লাখ ১০ হাজার, নিজের জমির গাছ বিক্রি এবং নিজের কাছে থাকা টাকা মিলিয়ে নগদ ৫ লাখ ১২ হাজার টাকা দেন ছেলেকে জমি চাষাবাদ করার জন্য। এরপরই বাবার ওপর নেমে আসে ছেলে আব্দুল হামিদ ও তার এইচএসসি পড়ুয়া ছেলে (বৃদ্ধের নাতি) আমির হামজার অত্যাচার।
বিভিন্ন সময়ে ছেলে ও নাতি ছেলের অত্যাচারে বৃদ্ধ মাঝে মাঝেই মেয়েদের বাড়িতে গিয়ে থাকেন। ছেলে আব্দুল হামিদ নিজের স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুর বাড়ির গ্রামে চলে যান এবং সেখানে জমির চাষ করতে থাকেন।
অন্যদিকে বৃদ্ধের বাড়িতে নাতি আমির হামজা এবং বৃদ্ধ থাকেন। প্রায় আড়াই মাস আগে বৃদ্ধের নাতি আমির হামজা বৃদ্ধকে মারপিট করে তার ব্যবহৃত ব্যক্তিগত একটি বাইসাইকেলও কেড়ে রেখে বৃদ্ধ মতিয়ার রহমানকে বাড়ি ছাড়া করেন। তাকে হুমকি দেয়া হয় এবার বাড়িতে আসলে মেরে ফেলা হবে। বৃদ্ধ ভয়ে আশ্রয় নেন পাশের গ্রামে মেয়ের বাড়িতে। সেখানে খাওয়া-দাওয়া করেন আর দিনের বেশিরভাগ সময় কাটান মসজিদে। বাড়িতে ফেরার জন্য বৃদ্ধ নানাজনকে ধরেন। কোনো কাজ হয় না।
ওয়ার্ডের মেম্বার, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, ইউপি চেয়ারম্যান এমনকি থানা-পুলিশ পর্যন্ত স্মরণাপন্ন হন বৃদ্ধ। তবে ছেলে-নাতি কোনোমতেই সেসব বিচার-ফায়সালা মানতে রাজি হয় না। এক পর্যায়ে বৃদ্ধ মতিয়ার রহমান চৌগাছার ইউএনও ইরুফা সুলতানার কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। পরে ইউএনও উপজেলার সার্ভেয়ার এবং সংশ্লিষ্ট ইউপির ভূমি সহকারী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন ওই জমি পরিমাপ করে বৃদ্ধের জমি বৃদ্ধের কাছে বুঝিয়ে দিতে।
সেখানে সার্ভেয়ার জহির উদ্দিন ও ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার সঙ্গেও বৃদ্ধের নাতি আমির হামজা খারাপ ব্যবহার করেন। পরে ১৬ আগস্ট ইউএনও বৃদ্ধের ছেলে ও নাতির কাছে নির্দেশনা পাঠান বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার মধ্যে বৃদ্ধের কাছে জমি ও বাড়ি বুঝিয়ে দিতে। এতেও বুঝিয়ে না দিলে বৃহস্পতিবার দুপুরে ইউএনও ইরুফা সুলতানা পাতিবিলা ইউপি চেয়ারম্যান আতাউর রহমান লাল, হাকিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল হাসান, পাতিবিলা ইউপির মেম্বার এবং ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাসহ বৃদ্ধ মতিয়ার রহমানের বাড়িতে যান।
সেখানে বৃদ্ধের ছেলে আব্দুল হামিদ, পুত্রবধূ এবং নাতি আমির হামজাকে নিয়ে বসে বৃদ্ধ মতিয়ার রহমানকে তার বাড়ি বুঝিয়ে দেন। প্রথমে রাজি না হলেও ছেলে আব্দুল হামিদ এক পর্যায়ে বাবার কাছ থেকে নেয়া ৫ লাখ ১২ হাজার টাকার মধ্যে ৩ লাখ টাকা দিতে সম্মত হন। পরে ইউএনও বৃদ্ধ বাবা, তার ছেলে ও পুত্রবধূ এবং নাতিকে এক সঙ্গে মিলিয়ে দেন।
বৃদ্ধ মতিয়ার রহমান বলেন, ‘আমি এখন খুশি। ইউএনও বিষয়টি সমাধান করে দিয়েছেন।’
হাকিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল হাসান বলেন, ‘অনেকদিন ধরেই তাদের পারিবারিক এই দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। কোনোভাবেই বিষয়টি মিটছিলো না। অবশেষে ইউএনওর হস্তক্ষেপে বিষয়টির সমাধান হলো।’
পাতিবিলা ইউপি চেয়ারম্যান আতাউর রহমান লাল, ‘বিষয়টি নিয়ে আমার ইউপি মেম্বাররা কয়েকবার বসলেও সমাধান হয়নি। অবশেষে বিষয়টির সমাধান হয়েছে।
ইউএনও ইরুফা সুলতানা বলেন, বৃদ্ধের অভিযোগের ভিত্তিতে সার্ভেয়ার ও নায়েবকে জমিটি মেপে সমাধান করে দিতে পাঠানো হয়। সেখানে তার নাতি সার্ভেয়ারের সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করে। ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে দ্বন্দ্বে বৃদ্ধ বাবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা শুরু করে। বিষয়টি তাদের বাড়িতে গিয়ে সমাধান করে দেয়া হয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: ডঃ মুফতি বনি ইয়ামিন
অক্সফোর্ড সোলার টেকনোলজি গ্রুপ