পৃথিবীর সব রাত এক রকম নয়। কিছু রাতের নিজস্ব নাম থাকে। নিজস্ব গন্ধ থাকে। থাকে অদৃশ্য এক উত্তেজনা। সেই রাতে ক্যালেন্ডারের তারিখ গুরুত্ব হারায়, ঘড়ির কাঁটা নিজের ছন্দ ভুলে যায়। কোটি কোটি মানুষ একটি বাঁশির অপেক্ষায় থাকে। একটি বলের অপেক্ষায়। একটি গোলের অপেক্ষায়।
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের রাতে পৃথিবীর অসংখ্য শহরে আলো নিভেছিল, ঘুম নামেনি। ঢাকা থেকে বুয়েনস আইরেস, কলকাতা থেকে কর্ডোবা, লন্ডন থেকে লিসবন অসংখ্য ঘরে টেলিভিশনের নীল আলোই ছিল একমাত্র জেগে থাকা প্রদীপ।
রাস্তাঘাট অস্বাভাবিক নীরব হয়ে গিয়েছিল। রাতজাগা চায়ের দোকানের আড্ডা থেমে গিয়ে চোখ আটকে ছিল পর্দায়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্মব্যস্ত চিকিৎসকরাও সুযোগ পেলেই স্কোর দেখছিলেন। বিমানবন্দরের কর্মী, ট্যাক্সিচালক, নিরাপত্তারক্ষী, দূর সমুদ্রে ভেসে চলা নাবিক যেখানেই মানুষ, সেখানেই একই প্রশ্ন, ‘স্কোর কত?’ পৃথিবী নিজের নিয়মে চলছিল, মানুষের মন চলে গিয়েছিল হাজার মাইল দূরের এক টুকরো সবুজ ঘাসে।
১৯৬৬-এর বিতর্ক, ১৯৮৬-তে ম্যারাডোনার ‘ঈশ্বরের হাত’ ও শতাব্দীর সেরা গোল, ১৯৯৮-এর উত্তেজনা দুই দেশের ফুটবল ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় আবার জেগে উঠেছিল। নতুন প্রজন্ম খেলছিল, ছায়ার মতো পাশে হেঁটে যাচ্ছিল অতীত।
শুরুর বাঁশি থেকেই প্রতিটি ট্যাকল ছিল যুদ্ধের মতো, প্রতিটি দৌড়ে মিশে ছিল চার বছরের অপেক্ষা। বলের দখল যেমন বদলাচ্ছিল, তেমনি বদলাচ্ছিল কোটি মানুষের হৃদস্পন্দনের ছন্দও।
স্কোরলাইন যখন ১-১, তখন মনে হচ্ছিল ম্যাচটি হয়তো আরও দীর্ঘ হবে। গ্যালারিতে কেউ বসে ছিল না। টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা মানুষও অজান্তেই উঠে দাঁড়িয়েছিল। সেই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বস্তুটি ছিল একটি ফুটবল।
তারপর এল ৮৫ মিনিট। মুহূর্তেই আর্জেন্টিনার আক্রমণ ছুটে গেল সামনে। ইংল্যান্ডের রক্ষণ এক সেকেন্ডের জন্য ছন্দ হারাল।সেই ক্ষণিকের ফাঁকেই লাউতারো মার্তিনেজ বল জড়িয়ে দিলেন জালে। ২-১।
তারপর প্রতিটি সেকেন্ড এক একটি যুগের মতো দীর্ঘ লাগছিল। ইংল্যান্ড শেষ শক্তিটুকু দিয়ে আক্রমণ করেছে। লম্বা বল তুলেছে, বক্সে মানুষ বাড়িয়েছে। আর্জেন্টিনা পাহারা দিয়েছে একটি স্বপ্নকে।
শেষ বাঁশি বাজতেই স্টেডিয়াম আর স্টেডিয়াম থাকেনি। সেটি হয়ে উঠেছিল আনন্দের বিস্ফোরণ। নীল-সাদা জার্সিগুলো একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেছিল। কেউ হাঁটু গেড়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। কেউ দুই হাত তুলে আকাশের দিকে তাকিয়েছিলেন। কেউ ঘাসে শুয়ে চোখ বন্ধ করেছিলেন। আনন্দেরও কখনো ভাষা থাকে না,শুধু অশ্রু থাকে, আলিঙ্গন থাকে, বুকভরা নিঃশ্বাস থাকে।
বুয়েনস আইরেসের ওবেলিস্কোর চারপাশ মুহূর্তেই উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছিল। পতাকা উড়ছিল, গাড়ির হর্ন বাজছিল, গান গাইছিল মানুষ। অপরিচিত মানুষও অপরিচিতকে জড়িয়ে ধরছিল। পুরো আর্জেন্টিনা এক বিশাল পরিবার হয়ে উঠেছিল।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডের ড্রেসিংরুমে নেমে এসেছিল দীর্ঘ নীরবতা। ফুটবল কখনো কখনো নিষ্ঠুরতম শিল্প। নব্বই মিনিটের লড়াই, ঘাম, পরিকল্পনা সবকিছু একটি বাঁশির সঙ্গে শেষ হয়ে যায়। বিজয়ীরা ইতিহাস লেখে, পরাজিতরা শুধু নীরবে সেই ইতিহাস পড়তে থাকে।
নীল-সাদা জার্সির গল্প এখনো শেষ হয়নি। কিংবদন্তিরা বিদায় নিয়েছেন, স্বপ্নের উত্তরাধিকার এখনো জীবন্ত। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করল, তখন পৃথিবীর অনেক শহরে ভোর হয়ে গিয়েছিল। সূর্য উঠছিল। মানুষ নতুন দিনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। যারা সেই ম্যাচ দেখেছিল, তাদের চোখে তখনও রাত বেঁচে ছিল। কিছু রাত সূর্য উঠলেও শেষ হয় না কিছু রাত ইতিহাস হয়ে যায়।
সেই ইতিহাসের এক পাতায় চিরকাল লেখা থাকবে? একটি বিশ্বকাপের রাতে পৃথিবী ঘুমানোর চেষ্টা করেছিল। জেগে ছিল কোটি মানুষ। আর সবচেয়ে বেশি জেগে ছিল একটি দেশ।আর্জেন্টিনা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: ডঃ মুফতি বনি ইয়ামিন
অক্সফোর্ড সোলার টেকনোলজি গ্রুপ